বাংলাদেশের গণতন্ত্র ও রাজনৈতিক অঙ্গন দীর্ঘদিন ধরে
অনিশ্চয়তা, অচলাবস্থা ও পারস্পরিক অবিশ্বাসে জর্জরিত। একদিকে গত ৫ আগস্ট
২০২৪ ক্ষমতাচ্যুত টানা চারবারের মতো ক্ষমতায় থাকা দলের নির্বাচন নিয়ে
বিএনপির বারবার অভিযোগ ; অন্যদিকে বিগতদিনে কার্যত রাজনীতি ও নির্বাচন থেকে
ছিটকে পড়ে যায় দেশের এই বৃহৎ রাজনৈতিক দল ও তিনবার রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় থাকা
বিএনপি।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বহু বাঁক
এসেছে। কখনো তা অভ্যুত্থান বা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে, কখনো বা অপ্রত্যাশিত
কোনো ঘটনার পরিণতিতে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের আকস্মিক
পতন এবং ৮ আগস্ট ড.
মুহাম্মদ ইউনুসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান
উপদেষ্টা হিসেবে শপথ গ্রহণ, নিঃসন্দেহে তেমনই এক মুহূর্ত। বহু বছর ধরে
দুর্নীতি, একদলীয় কর্তৃত্ববাদ ও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার অপব্যবহার নিয়ে
দেশব্যাপী ক্ষোভ এক পর্যায়ে বিস্ফোরণ ঘটায়।
অন্তর্বর্তীকালীন
সরকারের শুরুতে যে তিনটি অঙ্গীকার উচ্চারিত হয়—রাষ্ট্রীয় সংস্কার, জুলাই
২০২৪ সালের ভয়াবহ গণহত্যার বিচারের উদ্যোগ, এবং সর্বোপরি ২০২৬ সালের জুনের
মধ্যে সকল রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণে একটি গ্রহণযোগ্য জাতীয় সংসদ নির্বাচন।
এদিকে সরকার সম্প্রতি ২০২৬ সালের এপ্রিলের প্রথমার্ধে নির্বাচনের তারিখ
ঘোষণা করেছে। এ নিয়েও আছে আলোচনা-সমালোচনা। এতেও সন্তুষ্ট নয় দলটি।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে রাজনৈতিক বাস্তবতা অনেকটাই আরো পাল্টে গেছে।
বিএনপি
আবারও স্পষ্টভাবে বলছে, অন্তর্বর্তী সরকারের কাজ নির্বাচন আয়োজন করা,
সংস্কার বা বিচার নয়। তাদের মতে, একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের জন্য সর্বোচ্চ
৯০ দিন সময় যথেষ্ট। আর ডিসেম্বর ২০২৫ এর মধ্যে এ নির্বাচন আয়োজন করতে
হবে। বিপরীতে, বর্তমান সরকার বলছে—দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনার কারণে
রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে গণতন্ত্র, জবাবদিহি এবং নিরপেক্ষতা
পুনঃপ্রতিষ্ঠা ছাড়া একটি টেকসই নির্বাচন সম্ভব নয়।
এই
বিতর্ককে নিছক সময় নিয়ে মতপার্থক্য হিসেবে দেখা ভুল হবে। এর অন্তরালে
রয়েছে রাষ্ট্র ও রাজনীতির ভবিষ্যৎ কাঠামো নিয়ে এক গভীর দর্শনগত দ্বন্দ্ব।
অন্তর্বর্তী
সরকার একপ্রকার ‘ট্রানজিশনাল জাস্টিস’ কাঠামোতে কাজ করছে—যেখানে অতীতের
অন্যায় ও দমন-পীড়নের বিচার, প্রশাসনিক সংস্কার ও রাজনৈতিক ভারসাম্য
প্রতিষ্ঠাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। কিন্তু বিএনপি বলছে, এই সংস্কার
নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের কাজ; একটি অনির্বাচিত সরকার যেন দায়িত্ব গ্রহণ
করে দীর্ঘ সময় ধরে রাষ্ট্র চালায়—এটা এক ধরনের অপ্রত্যক্ষ কর্তৃত্ববাদ।
এই
মতানৈক্য থেকেই বিরোধিতা, অভিযোগ এবং রাজনৈতিক দূরত্ব বাড়তে থাকে।
ইতোমধ্যে বিএনপির নেতারা দেশের বিভিন্ন প্রান্তে সমাবেশ ও গণজমায়েতের
মাধ্যমে নির্বাচন দ্রুত আয়োজনের দাবি তুলেছে। রাজনৈতিক অঙ্গনে উত্তেজনা
বাড়ছে। ফলে এমন এক সময়ে লন্ডনে অনুষ্ঠিতব্য একটি বৈঠক নতুন করে আলোচনার
জন্ম দিয়েছে।
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ও সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনুসের সাক্ষাৎ: এটি কাকতালীয় নাকি কৌশলগত?
আগামী
১৩ জুন, শুক্রবার লন্ডনে সাক্ষাৎ করতে যাচ্ছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত
চেয়ারম্যান তারেক রহমান ও অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা নোবেল
বিজয়ী অর্থনীতিবীদ প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনুস।
প্রথমে বিষয়টি অনেকের কাছে কাকতালীয় বলে মনে হতে পারে। তবে রাজনৈতিকভাবে এটি নিঃসন্দেহে এক কৌশলগত মুহূর্ত।
দুই
পক্ষই জানেন, তাদের মধ্যে বিরোধ ও মতপার্থক্য যতই থাকুক না কেন, রাষ্ট্রের
স্বার্থে একটি সমঝোতা ছাড়া সামনে এগোনো সম্ভব নয়। ড. ইউনুস যেভাবে একটি
কার্যকর, অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন চান, ঠিক তেমনই বিএনপিও চাইছে সরকার
পরিবর্তনের একটি সাংবিধানিক পথ। কিন্তু তাদের পথ ও সময়সীমা ভিন্ন।
এই
বৈঠক যদি শুধুই সৌজন্যমূলক হয়, তাহলেও এটি একটি বার্তা বহন করে—পক্ষগুলো
মুখোমুখি বসতে প্রস্তুত। আর যদি এর মধ্য দিয়ে কোনো সমঝোতার ভিত্তি তৈরি হয়,
তবে তা হতে পারে দেশের রাজনৈতিক অচলাবস্থা নিরসনের সূচনা বিন্দু।
প্রত্যাশা ও বাস্তবতা: মেলানো কি সম্ভব? বাংলাদেশে
একটি
দীর্ঘদিনের প্রবণতা হলো—সংকট এলে সবাই সংলাপের কথা বলেন, কিন্তু বিশ্বাস ও
স্বচ্ছতার অভাবে সংলাপ বাস্তবায়িত হয় না। অতীতেও তত্ত্বাবধায়ক সরকার,
জাতীয় সংলাপ বা মধ্যবর্তী নির্বাচন নিয়ে বহু আলোচনা হয়েছে। কিন্তু রাজনৈতিক
দলগুলোর অনমনীয়তা, ব্যক্তি-স্বার্থ ও বিদেশি প্রভাব—সব মিলে উদ্যোগগুলো
ব্যর্থ হয়েছে।
তবে এইবার পরিস্থিতি ভিন্ন। একটি দল
ক্ষমতায় নেই, আর অন্যটি সরকারে নেই। এমন এক ভারসাম্যহীন সময়ই প্রকৃত
সংলাপের জন্য উপযুক্ত সময়। বিশেষ করে যখন দুটি প্রধান রাজনৈতিক শক্তির
প্রধান মুখ একান্তে বসেন, তখন জনগণের আকাঙ্ক্ষা আরও জোরালো হয়—তারা চায়, এই
আলোচনার মধ্যে দিয়ে যেন সহিংসতা ও সংঘাত নয়, বরং সমঝোতা ও স্থিতিশীলতার পথ
উন্মুক্ত হয়।
সামনে কী? এই বৈঠক একটি গভীর রাজনৈতিক
সংকট নিরসনের সূচনা হতে পারে, আবার হতে পারে নিছক একটি ভদ্রতা বিনিময়।
কিন্তু, এই মুহূর্তে বাংলাদেশ যে উত্তাল ও অনিশ্চিত রাজনৈতিক স্রোতের মধ্যে
দিয়ে যাচ্ছে, সেখানে প্রত্যেকটি সম্ভাবনাকেই গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা
জরুরি।
ড. ইউনুসের সরকার যদি সত্যিই গণতান্ত্রিক
প্রক্রিয়া প্রতিষ্ঠা করতে চায়, তাহলে রাজনৈতিক শক্তিগুলোর আস্থা অর্জনই হতে
হবে প্রথম ধাপ। আর বিএনপি যদি সত্যিই একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন চায়, তাহলে
দীর্ঘমেয়াদি অবস্থান পরিহার করে একটি মধ্যপন্থা খোঁজা তাদের জন্য
কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
সবমিলে বলা যায়- বাংলাদেশের
ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়—সংকটের সময়েও রাজনৈতিক সমঝোতা সম্ভব হয়েছে। সেই সমঝোতা
কখনো এসেছে আন্দোলনের চাপে, কখনো আন্তর্জাতিক সমর্থনের ঘূর্ণিতে, আবার
কখনো ব্যক্তিগত সাহসী পদক্ষেপে।
লন্ডনের এই বৈঠক কতটা
ফলপ্রসূ হবে, তা এখনই বলা কঠিন। কিন্তু এই মুহূর্তে দেশের জন্য সবচেয়ে
জরুরি—একটি নিরপেক্ষ, গ্রহণযোগ্য ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের পথ তৈরি করা।
সেটি যদি হয় এই বৈঠকের মাধ্যমে, তবে এ শুধু একটি কূটনৈতিক সাফল্য নয়—বরং তা
হবে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ গণতন্ত্রের জন্য এক গুরুত্বপূর্ণ মোড় ঘোরানো
অধ্যায়। আর দেশের আঠারো কোটি মানুষ সেটাই চায়। সবার চোখ এখন লন্ডনের দিকে।